ঠিক কি ঘটেছিলো সেই বিষাক্ত দিনে? কেমন ছিল সেদিন?পড়ুন…

Published by BADGEB Admin on

Last Updated 1:00 PM 5th December 2019 .

Rahul Bhattacharya, BADGEB : Dec 5, 2004, সেদিন রবিবার। কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে 26 তম ফেডারেশন কাপ ফাইনাল চলছে। ম্যাচ শেষ হতে আর তেরো মিনিট বাকি, তারপর এক্সট্রা টাইম। টিম ডেম্পো তখন প্রথমার্ধের একগোলে এগিয়ে , প্রতিপক্ষ কোচ সুব্রত ভট্টাচার্যের মোহনবাগান। আর্মান্দো কোলাসোর মুখে একটা চাপা টেনশন দেখা যাচ্ছে, তিল তিল করে সন্তানসম যত্নে বড় করে তোলা ক্লাবটিকে প্রথমবার ফেড কাপের মঞ্চে জয়ী দেখার স্বপ্ন তিনি দেখছেন টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই। এবার তার স্বপ্নের দলে রন্টি মার্টিনসের সঙ্গী হিসেবে কলকাতার ইস্টবেঙ্গল থেকে নিয়ে এসেছেন গত ন্যাশনাল লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতাটিকে। একগোলে এগিয়ে থাকাটা বাগানের মতো দলের বিরুদ্ধে মোটেই নিরাপদ নয় সেটা তিনিও জানেন। উৎসুক হয়ে দেখছেন কিভাবে মোহনবাগানের ডিফেন্স ভাঙা যায়। এমন সময় যেন তাঁর মনের কথা বুঝতে পেরেই বাগানের ডিফেন্স ভেদ করে ছিটকে বেরোলো তার টিমের দশ নম্বর জার্সি পরা ছেলেটা !!

ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে মাত্র চার মাস আগে গোয়ায় আসা পঁচিশ বছরের ব্রাজিলিয়ান সেই ছেলেটা ক্রিস্টিয়ানো সেবাস্তিয়াস ডি লিমা জুনিয়র। বিয়াল্লিশ মিনিটে ম্যাচের প্রথম গোলটিও সেই করেছে, এবার দ্বিতীয় গোলের গন্ধে ছুটে চলেছে সে। আটাত্তর মিনিটে সম্ভবত লাজারুশ ফার্নান্দেজের বাড়ানো লফ্টেড বল ফলো করে গতি বাড়িয়ে যখন বক্সে ঢুকলো তখন গোলকিপার সুব্রত পালও ছুটে এসেছে বলটা কালেক্ট করার জন্য। জুনিয়রের ডান পা নিখুঁত প্লেসিংয়ে কোনাকুনি গোলের মুখ খুঁজে নিলো আর একই সময়ে সুব্রত পাল সজোরে ধাক্কা খেলো জুনিয়রের গায়ে। জুনিয়র আছড়ে পড়ল মাটিতে।

গোলের আনন্দে মশগুল রণ্টি আর প্রকাশ প্রায় মিনিট দুয়েক পর অচেতন জুনিয়রকে লক্ষ্য করলো আর গোলের সেলিব্রেশন চলছে ভেবে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেফারি মেডিকেল হেল্প চাইলেন পাঁচ মিনিট পর। কিন্তু মাঠে কোনো ডাক্তারই ছিলো না সেদিন, ফিজিওরা এলেন, মুখে মুখ লাগিয়ে পাম্প করলেন, ফুটবলাররা জার্সি খুলে হাওয়া দিতে থাকলেন, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে থাকলেন সে বছরই ডেম্পোতে যোগ দেওয়া বঙ্গসন্তান গোলরক্ষক অভিজিৎ মন্ডল।অবশেষে নিয়ে যাওয়া হলো পাশের হাসমত হসপিটালে। 2-0 গোলে ডেম্পোর সেই প্রথম ফেড কাপ জয় আর দেখে যাওয়া হয় নি জয়ের আসল কারিগরের। ততক্ষনে ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়র পাড়ি দিয়েছেন তার প্রানপ্রিয় জেসাসের কাছে। যে জেসাসের চার্চ আর পর্তুগিজ ভাষাভাষী মানুষের সান্নিধ্যে থাকার জন্য সে কলকাতা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিল গোয়া। অনেকে বলেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারাও নাকি তেমন চেষ্টা করেন নি জুনিয়রকে ধরে রাখার।

ফিরে আসি 2003-04 এ। জুলাই মাসে আসিয়ানের ঐতিহাসিক সাফল্যের পর অন্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট থেকেও ইস্টবেঙ্গলের কাছে অংশগ্রহণের অনুরোধ আসতে শুরু করে। আগ্রাসী সুভাষ ভৌমিক চেয়েছিলেন সেই প্রবল শক্তিধর টিমকে নিয়ে আরো বেশি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে, কিন্তু কর্তারা দেশীয় ফেড কাপ ও শিল্ডে দলের অংশগ্রহণে সিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। শোনা যায় মনোমালিন্যও হয়েছে সুভাষের সাথে কর্তাদের এই নিয়ে। অগাস্ট মাসে ফেড কাপে খুব খারাপ খেললো দল, প্রথম রাউন্ডেই ছিটকে গেলো। সেপ্টেম্বরে শিল্ড সেমিফাইনালে বাগানের কাছে ট্রাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিলো আর নভেম্বরে ডুরান্ড ফাইনালে উঠেও সালগাঁওকারের কাছে ফের ট্রাইব্রেকারে হেরে বসলো দল।

ধারাবাহিক ব্যর্থতায় সুভাষ ভৌমিকের সিংহাসন টলোমলো, কর্তাদের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। খামখেয়ালি ওকোরোর সেই আগুনে ফর্ম নিষ্প্রভ। এই অবস্থায় শুরু হলো অষ্টম ন্যাশনাল লীগ।
প্রথম তিনটে ম্যাচে মাত্র দু পয়েন্ট পেলো দল, হেরে বসলো সালগাঁওকারের কাছে। আরো চাপে পড়লেন সুভাষ। ভগ্নহৃদয় ও চিন্তিত ভোম্বলদাকে আশ্বস্ত করে ডগলাস ডি সিলভা তখন নিজের দেশ ব্রাজিলের আমেরিকো ফুটবোল ক্লুব থেকে নিয়ে এলেন ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়র বলে চব্বিশ বছরের লম্বা রোগা এক স্ট্রাইকারকে।

পরে ভৌমিক বলেছিলেন : “সে সময় আমার কোচের চাকরি বাঁচিয়েছিলো জুনিয়র”।
সংসারী , লাজুক ও অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ছেলেটি ছুটির দিনে ঘুরতো কলকাতার চার্চগুলিতে আর স্ত্রীকে নিয়ে ঘনঘন যেত খুব প্রিয় আলিপুর চিড়িয়াখানাতে। ইংলিশটা একদম পারতো না দুজনেই , তাই জীব জন্তুদের মাঝেই হয়তো স্বচ্ছন্দ বোধ করতো কিন্তু মাঠে বাইচুংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে আগুন ঝরাতো সে। আঠেরোটা ম্যাচে পনেরো গোল করেছিলো নিজেই আর বাইচুংয়ের সঙ্গে জুটিতে সাতাশ গোল !! লীগের দ্বিতীয় ডার্বিতে জুনিয়র ও বাইচুংয়ের গোলে 2-1এ বাগানকে হারিয়ে দি আমরা। প্রথম তিন ম্যাচে মাত্র দুই পয়েন্ট পাওয়া ইস্টবেঙ্গল বারো দলের লীগ জিতে নেয় দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডেম্পোর থেকে চার পয়েন্ট বেশি নিয়ে।

এক মরসুমে কলকাতা লিগ, আসিয়ান, ন্যাশনাল লীগ জিতে সুভাষ ইতিহাস সৃষ্টি করেন। টপ স্কোরার হয়ে ন্যাশনাল লীগ জিতিয়ে ইস্টবেঙ্গল জনতার নয়নের মনি হয়ে উঠলো জুনিয়র। পর পর সাত ম্যাচে গোল করার অবিশ্বাস্য নজির গড়েছিলো আর ক্লাবের জেতা শেষ জাতীয় লীগ ছিলো সেটা।

আসলে চ্যাম্পিয়ন্স লাক নিয়ে এসেছিলো ছেলেটা, ভালোবাসা আদায় করতো জানতো সে, মাত্র একটা টুর্নামেন্ট খেলেই লাল হলুদ জনতার সারাজীবনের ভালোবাসা কুড়িয়ে নিয়ে গেলো। ঈশ্বর বড় তাড়াতাড়ি নিজের কাছে নিয়ে গেলেন ওকে, কিন্তু ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের হৃদয় থেকে নিয়ে যেতে পারেন নি l ক্রিস্টিয়ানো সেবাস্তিয়াস ডি লিমা জুনিয়র অমর হয়ে রয়ে গেছে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল ইতিহাসে।


0 Comments

Leave a Reply

0 Shares
Copy link
Powered by Social Snap