ফিরে দেখা: হারিয়ে যাওয়া তারাদের কথা!

Published by Sabyasachi C on

Last Updated 6:21 PM 7th May 2020 .

সুমন্ত সেনগুপ্ত, badgeb.com : কলকাতা ময়দান। দু চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন কত শত খেলোয়াড় ছুটে আসে এই ময়দানে। চোখে তাদের রঙিন স্বপ্ন বড় দলে খেলার। কারো কারো সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, সুযোগ পায় বড় দলে খেলার। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত হয় বড় দলে আবার অনেকে সুযোগ না পেয়ে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলে। এর বাইরেও আবার একদল থাকে যারা বড় দলে শুরু করে সাড়া জাগিয়ে, অচিরেই দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয় কিন্তু হঠাৎই পদস্খলন ঘটে তাদের। হয়তো বা চোট কিংবা মাঠের বাইরের কোনো ঘটনায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় তারা। আজ এরকমই কিছু খেলোয়াড় নিয়ে আলোচনা করবো যারা ছোট দল থেকে ইস্টবেঙ্গলে এসে সাড়া জাগিয়ে শুরু করেও বিভিন্ন কারণে হারিয়ে গেছে অথচ এখনো তাদের মনে রেখেছে ইস্টবেঙ্গল জনতা। হয়তো বা ভাগ্য সহায় থাকলে বা নিজেদেরকে আরো একটু পেশাদারিত্বের মোড়কে মুড়ে ফেলতে পারলে নিশ্চিত ভাবেই অন্য খাতে বইতে পারতো তাদের খেলোয়াড়ি জীবন। আসুন দেখে নি এরকম কিছু খেলোয়াড়কে যাদের আজো মনে রেখেছে ইস্টবেঙ্গল জনতা।

১৯৮২ সাল। দিল্লি এশিয়ান গেমসের জন্য জাতীয় দলের শিবিরে একঝাঁক ইস্টবেঙ্গল তারকা। এই অবস্থায় কলকাতা লিগে প্রয়াত অমল দত্তের হাত ধরে উঠে এলেন দুই তরুণ। গোলকিপার তাপস চক্রবর্তী ও স্টপার পুলক বিশ্বাস। অচিরেই তারা মন জয় করে নিলেন ইস্টবেঙ্গল জনতার। সুঠাম চেহারার অধিকারী তাপস চক্রবর্তীর গোলকিপিং দক্ষতা দেখে ভবিষ্যতের আর এক ভাস্কর গাঙ্গুলির সম্ভবনা দেখতে পেতে থাকে ফুটবল মহল। লিগে মোহামেডানের বিপক্ষে মজিদের দুরন্ত ভলি বাজপাখির ভঙ্গিতে এক বারপোস্ট থেকে আর এক বারপোস্ট অব্দি উড়ে গিয়ে তাপস চক্রবর্তীর অবিশাস্য সেভ দেখে মোহিত হয়ে পড়ে ইস্টবেঙ্গল জনতা। কলকাতা লিগে দর্শকদের মন জয় করে নেয় এই তরুণ গোলরক্ষক। এশিয়াডের পর ভাস্কর গাঙ্গুলি ফিরে এলে জায়গা ছাড়তে হয় তাপস কে আর তারপরই অদ্ভুত ভাবে হারিয়ে যেতে থাকেন এই প্রতিভাবান গোলরক্ষক। আরো দু বছর অর্থাৎ ৮৪ সাল অব্দি ইস্টবেঙ্গলে থাকলেও আর নিজের ফর্ম ফিরে পান নি উল্টে ৮৪ এর ফেড ফাইনালে মোহামেডানের বিপক্ষে চোট পাওয়া ভাস্করের পরিবর্তে সুযোগ পেলেও প্রসূন ব্যানার্জির নিরীহ শট তার বুক থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসায় গোল খায় ইস্টবেঙ্গল এবং তার ইস্টবেঙ্গলে খেলার গল্পও সেখানেই শেষ হয়।

আমল দত্ত ও শঙ্কর মালি – ১৯৮২

পুলক বিশ্বাস ছিলেন স্টপারের খেলোয়াড়। জাতীয় ক্যাম্পে থাকা মনোরঞ্জন বিহীন ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্স কে কলকাতা লিগে একার কাঁধে নেতৃত্ব দেন এবং ডার্বিতে অসাধারন ফুটবল খেলেন। ইস্টবেঙ্গল জনতা যখন তাদের আদরের মনার সাথে পুলকের জুটির স্বপ্নে বিভোর তখনই হঠাৎ পদস্খলন ঘটে পুলকের। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকেন পুলক। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত ভাবে উঠে আসেন আর এক যুবক পরবর্তী কালে মনোরঞ্জনের সাথে যার জুটি প্রায় মিথে পরিণত হয়। হ্যাঁ তরুণ দে এর উত্থানের পর আর বিশেষ দাগ কাটতে পারেন নি পুলক।

৯২ সালে ইস্টবেঙ্গলে খেলতে আসেন প্রলয় সাহা। স্টপারের খেলোয়াড় প্রলয় প্রথম দিকে দলে সুযোগ না পেলেও অনূর্ধ্ব তেইশ কোটায় ফেডারেশনের প্রতিভা অন্বেষণে প্রোগ্রামিং এর সৌজন্যে জাতীয় দলের ক্যাম্পে সুযোগ পান এবং সেখানে তার খেলার অসাধারন পরিমার্জন ঘটে। ফিরে আসার পর ধীরে ধীরে ইস্টবেঙ্গলের প্রথম একাদশে নিয়মিত হয়ে ওঠেন প্রলয় এবং আস্থা অর্জন করে নেন ইস্টবেঙ্গল জনতার। পরের বছর অর্থাৎ ৯৩ সালেও বেশ সাড়া জাগিয়ে শুরু করেন প্রলয়। যখন ফুটবল মহল ধরে নিয়েছে আর এক দুর্দান্ত ডিফেন্ডার পেতে চলেছে ভারতীয় ফুটবল সেই সময়ই সিজার্স কাপ ফাইনালে মোহনবাগানের বিজয়ন তাকে জমি ধরিয়ে গোল করেন এবং তাতেই সম্ভবত আত্মবিশ্বাস নড়ে যায় প্রলয় সাহার। ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকেন তিনি। সুযোগ পেলেও তার খেলায় আর আগের ধার ছিল না এবং পরের বছর চাকরির জন্য তিনি চলে যান ছোট দলে এবং অজস্র মুখের মতো হারিয়ে যান প্রলয়। নষ্ট হয়ে যায় আর এক উঠতি প্রতিভা যাকে আজো মনে রেখেছেন সেই সময়ের ইস্টবেঙ্গল জনতা। বছর খানেক আগে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রলয়।

তপন দাস – ১৯৯২

৯২ সালেই ঝাঁকড়া চুলের এক মিডিও ইস্টবেঙ্গলে যোগ দেন এবং অচিরেই ইস্টবেঙ্গল জনতার ভরসার পাত্র হয়ে ওঠেন। সেই বছর আই এফ এর অনূর্ধ্ব উনিশ কোটায় সেই ঝাঁকড়া চুলের অধিকারী তপন দাস সি এফ এল ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে মাঠে নামেন যদিও তার অনূর্ধ্ব উনিশ কোটায় সুযোগ পাওয়া নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ডার্বিতে তার বক্স টু বক্স ফুটবলে মোহিত হয়ে ইস্টবেঙ্গল জনতা তাকে ‘গুলিট’ নামে অভিহিত করেন। অসম্ভব দমের সাথে দুর্দান্ত স্কিলের অধিকারী তপন ‘গুলিট’ দাস তখন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে আস্থার আর এক নাম। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে কলকাতা লীগের পরেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকেন তিনি। বিক্ষিপ্ত লগ্নে মাঝে মধ্যে ভালো খেললেও ‘গুলিট’আর ফিরে পাননি তার আগের ধারাবাহিকতা। আরো একবছর ইস্টবেঙ্গলে থাকলেও আর সেভাবে সুযোগ না পেয়ে ৯৪ সালে তপন দাস ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে চলে যান ছোট দলে এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যান। কয়েক বছর আগে প্রাণঘাতী ক্যান্সার কেড়ে নেয় তার জীবন। কিন্তু আজো ইস্টবেঙ্গল জনতা মনে রেখেছে তাকে।

দেবাশীষ পাল চৌধুরী

১৯৯৪ সালে এক দুর্দান্ত চেহারার অধিকারী, ঈষৎ ঝুকে হাঁটা এক ডিফেন্ডারের টি এফ এ থেকে ইস্টবেঙ্গলে আগমন ঘটে। মরশুমের প্রথম দিকে সেরকম সুযোগ না পেলেও মরশুমের মাঝপথে নঈম ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই তরুণ ডিফেন্ডার দেবাশীষ পাল চৌধুরী ইস্টবেঙ্গলের নিয়মিত ডিফেন্ডার হয়ে ওঠেন। আদপে স্টপার হলেও নঈম তাকে প্রথম দিকে রাইট ব্যাকে খেলাতে থাকেন। অবশ্য কিছুদিন বাদেই এই দুর্দান্ত প্রতিভার অধিকারী ডিফেন্ডার তার নিজের স্টপার জায়গা ফেরত পান। পরের মরশুমে তিনিই তখন ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্সের অটোমেটিক চয়েস। তার হাঁটা, চলা, অকুতোভয় মনোভাব, খেলার স্টাইল থেকে আরম্ভ করে ডিফেন্স কে লিড করার ক্ষমতার সাথে ইস্টবেঙ্গল জনতা মিল পেতে থাকে কিছু বছর আগে প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের। ৯৫ সালে দুর্দান্ত ভাবে মরশুম শেষ করেন তিনি এবং হয়ে ওঠেন ইস্টবেঙ্গল জনতার নয়নের মনি। এরপর ৯৬ সালে দেবাশীষ ইস্টবেঙ্গলে কোচ হিসাবে পান তার আদর্শ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য কে। ইস্টবেঙ্গল জনতা তখন শিষ্যের মধ্যে তাদের প্রিয় ও আদরের ঘরের ছেলে গুরুর মিল খুঁজে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। অচিরেই হঠাৎ ছন্দপতন। ফেডারেশন কাপ ফাইনালে ডেম্পোর বিপক্ষে একটি নিরীহ বল ধরতে গিয়ে হাঁটুতে চোট পান দেবাশীষ। ওই একটা চোটই কেড়ে নেয় দেবাশীষের বড় খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন। আরো একবছর ইস্টবেঙ্গলে থাকলেও আর ফিরে পাননি নিজেকে। তারপর মোহনবাগান, টালিগঞ্জ ঘুরেও আর নিজেকে ফিরে না পেয়ে চলে যান অনামী ছোট দলে এবং শেষ হয়ে যায় এক অসাধারন প্রতিভা যার কথা মনে পড়লে আজো দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ইস্টবেঙ্গল জনতা।

এরকম আরো অনেক প্রতিভা আছে যাদের গল্প মোটামুটি এক। তাদের কথা অন্যদিন বলা যাবে। আজ এইটুকুই থাক। সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এবং সাবধানে থাকুন। জয় ইস্টবেঙ্গল।


0 Comments

Leave a Reply

0 Shares
Copy link
Powered by Social Snap