“ওদের অবস্থা সেই কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার মতন। একটা ভালো পাত্র দেখে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল।” – একান্ত সাক্ষাৎকারে রসিকতায় মাতলেন মনোময় ভট্টাচার্য্য।

Published by BADGEB Admin on

Last Updated 10:55 AM 20th May 2020 .

ব্যাডজেব ডট কমের অরিত্র দাসকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন বিখ্যাত গায়ক এবং একজন একনিষ্ঠ ইস্টবেঙ্গল সমর্থক মনোময় ভট্টাচার্য্য। প্রশ্ন পরিকল্পনায় প্রবীর দাস। এবং সম্পূর্ণ কথোপকথনটি ড্রাফ্ট করলেন সাত্ত্বিক সরকার।

কথা দিয়েছিলেন ব্যাডজেব ডট কম’কে সময় দেবেন। কথা রাখলেন। বেশ ভালোভাবেই। তখন সকাল সাড়ে এগারোটা। আমাদের ওয়েবসাইটের তরফ থেকে অরিত্র দাস ফোনে ধরলেন বিখ্যাত গায়ক এবং একজন একনিষ্ঠ ইস্টবেঙ্গল সমর্থক মনোময় ভট্টাচার্য্য’কে। ফোন ধরে সকালের স্যালুটেশন শেষ করেই তিনি বলে উঠলেন,
“বাংলার অহংকার দেশের গৌরব ইস্টবেঙ্গল ফ্যান্স ক্লাবের সঙ্গে আমি অনেকদিন ধরে যুক্ত, সেখান থেকেই সব ভালো ভালো খবর পাই। অনেক ফেক নিউজ বেরোয় কিন্ত একটা সঠিক নিউজ করা পোর্টাল খুব দরকার ছিল।”

কথাগুলো শুনেই অরিত্র দাস আপ্লুত হয়ে পড়েন এবং মনোময় বাবু’কে জানান যে তিনি যে ব্যাডজেবকে রেগুলার বেসিসে ফলো করেন সেটাই অরিত্র এবং ব্যাডজেবের কাছে একটা বিশাল পাওনা। প্রত্যুত্তরে মনোময় বাবুও জানান, “যে ক্লাবকে ভালোবাসবে, সে ক্লাবের খবর তো রাখতেই হবে!”

এরপর শুরু হয় প্রশ্ন পর্ব। অরিত্রকে দেওয়া প্রশ্নের উত্তরগুলো দেওয়া রইল নীচে।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখা ঠিক কবে থেকে শুরু? আপনি ব্যক্তিগতভাবে বাঙাল না ঘটি?আপনার পূর্বপুরুষরা কোথাকার?

বললেন : আমি ঘটি। আমার দেশ বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুপুরের এক বিখ্যাত মানুষ ও বংশ পরম্পরায় পঞ্চম বংশধর আমি। সেই ভদ্রলোকের নাম হচ্ছে যদু ভট্ট। উনি বিষ্ণুপুরের বিশিষ্ট ধ্রুপদিয়া ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’কে গান শেখাতেন। ওঁর নামে বিষ্ণুপুরে “যদু ভট্ট মঞ্চ” আছে। জন্মসূত্রে ঘটি কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমি ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার। লাল হলুদ আমাকে সাংঘাতিক টানতো ছোটবেলায়। আমি ইস্টবেঙ্গল’কে চিনতে শিখেছি যখন আমার আট, নয় বছর বয়স, তখন থেকে। আমি যে পাড়ায় থাকতাম, সে পাড়ায় সাংঘাতিকভাবে ফুটবল খেলা হতো। বড়, ছোটরা একসাথে খেলতাম, তখন একটা লাল হলুদ জার্সি বানানো হয়েছিল।এখনকার মত প্রযুক্তি তখন ছিল না। আমি জার্সিটা কিনেছিলাম অমিয়দার কাছ থেকে।অমিয়দা আমাদের বেহালা’তেই থাকতেন এবং মোহনবাগান জুনিয়র দলে প্রশিক্ষণ করাতেন।জার্সিটার পেছনে আমি আমার তৎকালীন প্রিয় ফুটবলার শাবীর আলি এবং দশ নম্বরটা নিজে সুতো দিয়ে সেলাই করেছিলাম। বিকেল হলেই কালো প্যান্ট আর লাল হলুদ জার্সি পড়ে ফুটবল খেলতে চলে যেতাম।

প্রশ্ন : কার হাত ধরে ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হয়ে ওঠা? বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী মনোময় ভট্টাচার্য্যের ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার হয়ে ওঠার গল্পটা কি?

বললেন : কোনো কারুর হাত নেই। আমাদের ছোটবেলায় তো ব্ল্যাক অ্যান্ড ওয়াইট টিভি ছিল আর আমাদের পাড়ার বেশিরভাগ বাড়িতে টিভি ছিল না। আমার এক বন্ধু ছিল, ওর বাড়িতে টিভি ছিল। আমরা পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা দেখতে জড়ো হতাম। এটা ধরো ওই আটাত্তর, উনআশি অথবা আশি সাল নাগাদ। আমার তখন শৈশব। আমার এখনো মনে আছে তখন দূরদর্শন ছিল, ওখানেই একমাত্র লাইভ দেখানো হতো। আমার মনে আছে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটতো এবং আমরা সবাই অতিষ্ঠ হয়ে পড়তাম যে খেলা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। একমাত্র মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলাটাই দেখাতো, বাকি খেলাগুলো আমরা রেডিওতে রিলে শুনতাম বিভিন্ন ধারাভাষ্যকার যেমন অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার’দের। বিকেল চারটে থেকে খেলা হতো কলকাতা মাঠে আর খেলার সিজনটা ছিল গরমকাল, বর্ষাকাল। তখন কলকাতা লিগ, আইএফএ শিল্ড, ডিসিএম, রোভার্স কাপ এগুলো ছিল। এখনো মনে আছে উনআশি অথবা আশি সাল নাগাদ শ্যাম থাপার গোলে ইস্টবেঙ্গল হেরে যায়। সে ম্যাচটায় খুব দুঃখ পেয়েছিলাম হেরে যাওয়াতে। আর খেলা শেষ হলেই আমরা বন্ধুরা মাঠে নেমে পড়তাম জল কাদায়। আর আমরা কি করতাম, খেলার আগেই কাদা মেখে নিতাম যাতে কেউ আর পরে কাদা মাখাতে না পারে। ওই সময় থেকেই ফুটবলের প্রীতি শুরু হল। সারা পৃথিবীতে যত ফুটবলই হোক, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতি অন্যরকম একটা ফিলিংস। যতই ভালো ফুটবল হোক, খারাপ ফুটবল হোক, ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো ক্লাবের প্রতি আমার কোনো অ্যাট্র্যাকশন’ই নেই। আমি দেখি না, ইন ফ্যাক্ট কোনো নিউজও দেখি না। এখন দলবদলের খবর হচ্ছে সেটা দেখি। আজ সকালেও দেখলাম।ব্যাডজেবের খবরগুলোই সবার প্রথমে দেখি।নতুন কাউকে সই করানো হল কি না অথবা কে আসছে।

প্রশ্ন : নিজের গায়ক জীবনে সময় বাড় করে মাঠে যাওয়া হয়?

বললেন : হ্যাঁ মাঠে তো যাই, কিন্তু গতবছরটা যেতে পারিনি কারণ তখন এমন একটা পরিস্থিতি ছিল যে যেদিন’ই ইস্টবেঙ্গলের খেলা ছিল, সেদিন’ই আমার শো ছিল। শো থাকলেও, একটা খেলাও বাদ দিইনি। আমার একটা পাগলামি আছে, আই-লিগের ফিক্সচার বেরোলেই সেটা আমার সেক্রেটারি কে পাঠাই, বলি ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচের দিন যেন কোনো শো না নেয়। আমি খেলার দিনগুলো ফ্রি থাকি। আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ শো হলে সেটা আটটার পরে নিতে বলি। ট্যাব’এ খেলা চালিয়ে গাড়িতে দেখতে দেখতে যাই। আর মন খারাপ তো হয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সুখ-দুঃখে।

প্রশ্ন : জীবনের কোনো ঘটনার সাথে ইস্টবেঙ্গল অ্যাটিটিউডের মিল পান? জীবনের চড়াই-উতরাই অথবা স্ট্রাগেলের সময়গুলোতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের লড়াইয়ের কথা মাথায় আসে? লাল হলুদের অদম্য জেদটা কিভাবে অনুপ্রাণিত করে?

বললেন : আমার মনে আছে ছোটবেলায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যখন খেলা দেখতে যেতাম (কয়েকটা ম্যাচ যেতে পেরেছি), আমি হয় টিকিট কেটে অথবা রাম্পার্টে দাঁড়িয়েও ফুটবল খেলা দেখেছি। তখন এত নতুন রকমের পরিকাঠামো হয়নি আমাদের ক্লাবে। আসলে কি জানো এই লাল হলুদ জার্সিতে না একটা অদ্ভুত রকমের উচ্ছলতা, একটা ইন্সপিরেশনাল অনেক কিছু আছে আর কি। তো সেটাই আমাকে খুব ইনফ্লুয়েন্স করে আর কি। এবং আমাদের মশাল এবং মশাল-মোহিত আগুন। সে আগুনটা আমায় খুব ইন্সপায়ার করে আর কি। আমার মনে আছে যে বছর ইস্টবেঙ্গল ৫-৩ গোলে হারলো মোহনবাগানের কাছে, সেদিন আমার দুর্গাপুরে অনুষ্ঠান ছিল। আমি যখন স্টেজে উঠছি, তখন বোধহয় ইস্টবেঙ্গল এক গোলে হারছে। পরের দেড় ঘন্টা যে আমি কিভাবে গান গেয়েছি, সেটা আমিই জানি। তখন তো ট্যাব’এ খেলা দেখা যেত না, তো আমি আমার সেক্রেটারি’কে বারংবার গোল হয়েছে কি না জিজ্ঞেস করতে গিয়ে একটা দুটো গান ভুলই গেয়ে দিয়েছি। আমার একটা প্রিয় গান যেটা অনেকেই ভালোবাসে, সেই গানের লাইন ভুল গেয়ে দিয়েছি। এরকমটা এখনো হয়।নেরোকা’র সাথে যেটা আমরা ২-১ গোলে জিতলাম, সেদিন আমার শো ছিল তৃবেণী’তে। তো এনরিকে গোল করার পর এমন চিৎকার করেছি আমি, যে আমার গলা’ই ভেঙে গেল, গান করতে পারিনি ঠিকঠাক আর।

প্রশ্ন : এবার গানের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমরা মনোময়’দার গান শুনতে ভালোবাসি। কিন্ত মনোময়’দা কার কার গান শুনতে ভালোবাসেন?

বললেন : দেখো গান তো সকলেরই ভালো লাগে, তবু যদি তুমি বলো একটু পার্শিয়ালি কাউকে বেশি ভালো লাগে তাহলে বাংলা গানের জগতে বলছি মান্না দে’র গান।

প্রশ্ন : একটা মুহূর্ত অথবা ঘটনা যেটা ইস্টবেঙ্গল নিয়ে আপনি ব্যক্তিগতভাবে সব থেকে বেশি মনে রাখবেন এবং সমর্থক হিসাবে যেটা আপনাকে সব থেকে বেশি গর্বিত করেছে?

বললেন : ইস্টবেঙ্গলের সব থেকে গর্বের তো আশিয়ান জয়। ওই সময় আমিও দেখতাম খেলা।ফাইনালে বেকতেরো সাসানা’কে যে হারালো ওটা একটা। আর তো অনেক ট্রফি জিতেছে তার মধ্যে আমার একটা ভালো স্মৃতি মনে আছে, সুরজিৎ সেনগুপ্ত আউট-স্টেপ দিয়ে কর্নার মেরেছিলেন, সেটা শেষ মুহূর্তে ডিপ করে গোলে জড়িয়ে গিয়েছিল। সেটা ইয়ং ইয়ং না কোন টিমের বিরুদ্ধে মনে পড়ছে না, দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো টিমের বিরুদ্ধে মনে হয়। আরেকটা ম্যাচ যেটায় খুব আনন্দ পেয়েছিলাম, সেটা হল ১৯৯৭ সালের ডাইমন্ড ডার্বি ম্যাচ যেটা আমরা ৪-১ গোলে জিতেছিলাম। ওই সময় অমল দত্ত যেভাবে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব’কে খোঁটা দিচ্ছিলেন, সেটা খুব খারাপ লাগছিল একজন ইস্টবেঙ্গল সমর্থক হিসাবে। কিন্তু তারপর যখন চার গোল হল, তখন খুব আনন্দ হয়েছিল।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কোনো অনুষ্ঠানে স্টেজে থাকা অথবা সম্মানিত হওয়া। এই জিনিসগুলো কেমন লাগে?

বললেন : সে তো দারুণ। যে বছর কোয়েস আসলো সে বছর তো আমিই গান গাইলাম।তারপর আরেকটা প্রোগ্রাম যেটা আমাদের মাঠে হয়েছিল সেখানেও আমি গেয়েছিলাম। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারলে খুব ভালো লাগে। মজিদ বাস্কারের খেলা আমি দেখেছি। মজিদ-জমশিদ-খাবাজি। যদিও খাবাজি মহামেডানে বেশি খেলেছে। মজিদের খেলা এখনো আমার মনে আছে। মজিদ অসাধারণ একজন ফুটবলার, ওঁর দক্ষতা নিয়ে কিছু বলাই যায় না কিন্তু জামশিদ নাসিরি প্রথমদিকে যে খুব একটা ভালো খেলতেন তা নয়, মজিদের উপরে নির্ভর করে খেলতেন। মজিদ সেন্টার করতেন জামশিদ গোল করতেন অথবা মজিদ পাস করতেন জামশিদ গোল করতেন, গোলগেটার ছিলেন জামশিদ। মজিদ চলে যাওয়ার পর জামশিদ বাবুর খেলায় পরিবর্তন আসে। উনি খেলা তৈরি করতে পারতেন। আমার মনে আছে আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে গিয়ে আমরা দু’গোলে জিতেছিলাম। জামশিদ গোল করেছিলেন, আরেকটা গোল সম্ভবত শিশির ঘোষ করেছিলেন। এরকম অনেক উচ্ছাসের দিন মনে আছে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের।

প্রশ্ন : এত সাফল্য দেখেছেন কিন্তু এখন সাফল্য নেই বললেই চলে। এই বিষয় আপনার কি মতামত?

বললেন : এটা খুব দুঃখজনক। আসলে এক একটা ফেজ আসে। যেরকম আমাদের এন্টারটেইনমেন্ট জগতেও একটা বাজে সময় যায়।কোনো ফিল্মস্টারের হয়তো পর পর ছবি ফ্লপ করে।কোনো গায়কের হয়তো অনেক সুন্দর সুন্দর গান পপুলার হয় না অথচ একটা বাজে সিনেমা হিট করে যায়। একটা টাইম ফ্যাক্টর কাজ করে, সব কিছু ক্লিক করলেই তবে সব কিছু ঠিকঠাক থাকে।আশা করি সেই ব্যাড ফেজটা নিশ্চয়ই পেরিয়ে আসবে ক্লাব।

প্রশ্ন : আপনার গায়ক বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়?অথবা ডার্বিতে জেতা-হারা নিয়ে একে অন্যকে লেগ-পুলিং চলে? সেরকম কোনো বিশেষ ঘটনা আছে কি?

বললেন : (হালকা হাসি) না না সেটা এখন আর হয় না। আমার গায়ক বন্ধুদের মধ্যে রূপঙ্কর ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার আমি জানি কিন্তু আমি যেরকম পাগলামিটা করি সেটা ওদের মধ্যে নেই। আসলে এগুলোই মনে হয় আমাদের, আমার অন্তত মনে হয় যে বেঁচে থাকার রসদ। সবসময় তো লাইফে স্ট্রাগেল, রোজগার করা, বাইরে যাওয়া, বিদেশ যাওয়া, রেকর্ডিং করা এসব চলছে কিন্তু এটা হচ্ছে একটা সমাধান। যেদিন ইস্টবেঙ্গলের খেলা থাকে, আমি আর আমার ছেলে দুপুরবেলা রেস্ট নিয়ে প্রথমে টিভিটা চালাই ক্লাবের খেলা থাকলে। তো এই পাগলামো’টা আগেও ছিল আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে, এখনো আছে আর কি।

প্রশ্ন : আজ অব্দি আপনার দেখা সেরা ডার্বি কোনটি?

বললেন : একটা তো যেটা বললাম ৪-১। আরেকটা হল যেটায় ডু ডং দুটো গোল করেছিল,২০১৫ সালে। ওটাও চার গোলে জিতেছি, তবে ওটাতে পাঁচ, ছয় গোলও হয়ে যেতে পারতো। আরেকটা গোল খুব ভালো লেগেছিল, যেটাতে খাবরা গোল করল মোহনবাগান হাফ টাইমের পরে মাঠেই নামলো না, ওডাফা লাল-কার্ড দেখলো প্রথমার্ধে।

প্রশ্ন : এবার বর্তমান কিছু ঘটনায় আসি। বর্তমান সমর্থকদের মধ্যে একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে। তারা প্রাক্তন প্লেয়ারদের কোনো মন্তব্য করতে গিয়ে তাদের গৌরবময় অতীতকে অপমানিত করছে।আবার পক্ষান্তরেও প্রাক্তন খেলোয়াড়রা বর্তমান খেলোয়াড়দের নিয়ে অর্বাচীন সুলভ মন্তব্য করছেন। এই যে প্রাক্তন বনাম বর্তমানের দ্বন্দ্ব এটাকে কিভাবে দেখছেন আপনি? সমর্থকদেরই বা কি ভুমিকা?

বললেন : দেখো আমার মনে হয় যে প্রাক্তন এবং বর্তমান, এই দুটোই কিন্তু ভাইসি-ভার্সা দুজনের সাথে দুজনের সম্পর্ক। যদি কখনো কোনো সমর্থক, কোনো প্রাক্তন’কে কটুক্তি করে, তার কারণ হচ্ছে যে সেই প্রাক্তন হয়তো এই সময়ের কোনো প্লেয়ার’কে খারাপ কথা বলেছে, যেমন এরা কোনো প্লেয়ারই না, মানে অনেক নেগেটিভ কথা বলেন। সেটাও আমি দেখি, শুনি। এটা উচিত না কোনো প্রাক্তন প্লেয়ারের। হয়তো দুঃখ থেকেই হয় যে ক্লাব হেরে যাচ্ছে, সেখান থেকে একটা উষ্মা প্রকাশ করে। কিন্তু আমার মনে হয় যে এই উষ্মা প্রকাশ করাটা উচিত না। এটা অবশ্যই ঠিক যে কোনো টিমের কোনো প্লেয়ারই চায় না মাঠে নেমে হারতে কিন্তু হয়তো হেরে যাচ্ছে। সেখান থেকে বরং প্রাক্তনদের এগিয়ে এসে বলা উচিত প্লেয়ারদের যে তাদের কি সমস্যা হচ্ছে। গত বছর কোয়েসের সময় যেমন একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল যে প্রাক্তন প্লেয়াররা এসে প্লেয়ারদের উদ্বুদ্ধ করতে পারছে না, কর্মকর্তারাও প্লেয়ারদের সাথে ভালোভাবে কথা বলতে পারছে না। আমার মনে হয় এটা কখনোই করা উচিত না। যে কোনো প্রাক্তন ফুটবলারের বর্তমান ফুটবলার’কে ছোট করে দেখানো উচিত না। আমরা কি কখনো দেখতে পাই যে কপিল দেব বিরাট কোহলি’র সম্পর্কে খারাপ কথা বলছে?অথবা গাভাস্কার সচীনের সম্পর্কে খারাপ কথা বলছে? এঁরা প্রত্যেকেই কিন্তু প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমার মনে হয় এটা আমাদের ফুটবলেই হয়। এটা হওয়া উচিত না। আরেকটা কথা বলবো। সবকিছুতেই আমরা যা করেছি, সেটাই সেরা, এই ভাবনা’টা কিন্তু ভুল। তার কারণ, আমরা যখন ছোটবেলায় খেলা দেখতাম, সে সময় ফুটবলটা যেরকম ছিল, এখনকার ফুটবলের মধ্যে কিন্ত সেরকম ফুটবলের কোনো প্রভাব নেই। তখন কিন্তু রাফ অ্যান্ড টাফ ফুটবল হতো না। এখন কিন্তু অনেক টাফ ফুটবল হয়, মানে বডি কনট্যাক্ট গেম হয় বেশি এবং আমাদের সময় যাঁরা ফুটবল খেলতেন, তাঁরা কিন্তু অনেক সুখী ফুটবলার ছিলেন, অত ছোটাছুটি করে ফুটবল খেলতেন না।এখনকার ফুটবলারদের সবাইকেই উঠে নেমে খেলতে হয় এবং দ্রুত পাসিং করতে হয়। একটা উইং দিয়ে ফুটবল খেলা অথবা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার থ্রু বাড়াচ্ছে, তখন যে স্পিড, সে গতি কিন্তু তখনকার ফুটবলে ছিল না। আমার মনে হয় যে বর্তমান ফুটবল অনেক স্পিডি ফুটবল এবং অনেক বেশি লড়াকুও, সেটা মাথায় রাখতে হবে সিনিয়রদের। সম্মান দিলে তবেই সম্মান পাওয়া যায়। সম্মান না দিলে অসম্মানিত হতে হয় আরেকটা কথা, আগেকার দিনের প্লেয়াররা কিন্তু এত টাকা পেতেন না। যেমন গতবছর আলেহান্দ্রোর আন্ডারে কয়েকজন প্লেয়ার খেলতো, তারাই পরের বছর এত টাকা চেয়ে ফেলল যে ক্লাবের পক্ষে তাদের অ্যাফোর্ড করা সম্ভব হল না। আমার মনে হয় ক্লাবের সাফল্য তখনই আসবে যখন এই প্লেয়ারদের মধ্যে এই মোটিভেশান’টা গড়ে দেওয়া দরকার যে তোমরা ক্লাবকে রিপ্রেজেন্ট করছো, মানে এই ক্লাবের থেকে টাকা নিচ্ছো, তখন সেই অর্থের ট্রফি ফিরিয়ে দেওয়া। সেই মোটিভেশান’টা এই ফুটবলারদের দিতে হবে, নাহলে কিন্তু ক্লাবে সাফল্য আসবে না।
এ বছর তো ভালো কিছু ভারতীয় প্লেয়ার নেওয়া হয়েছে যদিও সবার নব্বই মিনিট খেলার গতি থাকবে না। কিন্তু তবুও যদি ভালো কিছু হয় আর কি।

প্রশ্ন : “ইস্টবেঙ্গল ইন আইএসএল নাকি ইস্টবেঙ্গল ইন আই লিগ” আপনি কোনটা দেখতে চান? এখন সমর্থকদের মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে যে ইস্টবেঙ্গল ভবিষ্যতে কোন লিগ খেলবে। আপনি এই ব্যাপারটাকে কিভাবে ট্যাকেল করছেন?

বললেন : আমার মনে হয় ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল’এই খেলা উচিত। অনেকে বলছে ইস্টবেঙ্গল আই লিগ পায়নি। কিন্তু আমি তোমাকে একটা কথা বলি, ইস্টবেঙ্গল কিন্ত জাতীয় লিগ তিনবার জিতেছিল। জাতীয় লিগের সাথে আই লিগের ডিফারেন্স কি? জাস্ট নামটা চেঞ্জ হয়ে গ্যাছে, ব্র্যান্ডিং চেঞ্জ হয়ে গ্যাছে। ইস্টবেঙ্গল তিনবার জিতেছে, মোহনবাগান পাঁচবার জিতেছে।আমি যদি ট্রফি দেখি সেখানে ইস্টবেঙ্গল এতবার কলকাতা লিগ জিতেছে, মোহনবাগান অনেক পিছিয়ে আছে, শিল্ডেও ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে আছে।আমার মনে হয় না যে আমরা আই লিগ পাইনি বলে আইএসএল না খেলে, যতদিন না আই লিগ পাচ্ছি, আই লিগ খেলে যেতে হবে, এই কথাটা ভুল।আমার মনে হয় এ বছর ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল’ই খেলা উচিত। এবার যদি স্পন্সর পাওয়া না যায় তাহলে তো কিছু করার নেই। তবে মুখ্যমন্ত্রী যখন একটা অনুরোধ করেছেন প্রফুল্ল প্যাটেল’কে, তখন দেখা যাক কি হয়। এখন লকডাউন’টা না উঠলে তো কিছুই বলা যাচ্ছে না না।

প্রশ্ন : পড়শি ক্লাব ATK’এর সাথে মার্জ হয়ে যাচ্ছে।অনেকে তো এটাই বলছেন যে আদতে মোহনবাগানের আর অস্তিত্ব রইলো না। রাইভাল টিমের সমর্থক হিসাবে কেমন লাগছে?

বললেন : দেখো, আমার যেটা মনে হচ্ছে যে এটিকে একটা ব্র্যান্ড যারা নিজেরাই এত বছর ধরে টিম চালিয়ে গ্যাছে। এবার তার সাথে মোহনবাগান যুক্ত হল কেন? না মোহনবাগানের সাপোর্টাররা এটিকে’কে সাপোর্ট করবে, এটাই হচ্ছে মূল ধারণা।আর তো কোনো কারণ নেই। মোহনবাগানের যে সাপোর্ট বেস’টা, সেটাকে এখন এটিকে ব্যবহার করবে। এতদিন তো মোহনবাগান সাপোর্টাররা এটিকে’কে সাপোর্ট করেনি। তারা তো বিরোধি ছিল এটিকে’র। মোহনবাগান এটিকের সাথে মার্জ করল। মার্জ করল মানে, আমার ধারণা মোহনবাগানের ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেল এবং সেটা সময় বলবে যে মোহনবাগান কতটা রইলো আর কতটা রইলো না। ঠিক আছে ওরা একটা নেগোশিয়েশন করে আইএসএল খেলছে। কিন্তু আমাদের উচিত এ বছর আইএসএল খেলা যাতে আমরা বলতে পারি যে আমরা মোহনবাগানের সাথে একই বছর আইএসএল খেলেছি।মোহনবাগান সাপোর্টাররা যাতে বলতে না পারে যে তোরা তো আমাদের থেকে পরে এসেছিস।

প্রশ্ন : আচ্ছা অনেকে এই কোয়েসের সাথে ইস্টবেঙ্গলের সংযুক্তিকরণ অথবা কিংফিশারের সাথে ইস্টবেঙ্গলের স্পন্সরশিপ আর এটিকে-মোহনবাগানের তুলনা করছে। আপনি কি মনে করেন দুটো জিনিস এক না আলাদা? কোয়েস যেমন একটা কম্পানি, কিংফিশার একটা কোম্পানি, সেখানে এটিকে একটা দল। একটা দলের সাথে আরেকটা দলের মিশে যাওয়া নিয়ে কি বলবেন?

বললেন : আমার মনে হয় একটু ডিফারেন্স তো আছেই। এবং যেখানে একটা নেগোসিয়েশন হল, যে আমরা তো আইএসএল খেলতে পারবো না।এটিকে একটা দল রয়েছে। তাদের সঙ্গেই মিশে যাই। তাদের’কে বলে দিই, আমাদের দলটা’কে তোমরা নিয়ে নাও, আমাদের ফ্যান বেস’কে তোমরা নাও আর তোমরা টাকা ঢালো সাফল্য আনো। এবার যেখানে দল তৈরি হবে, সেখানে তো মোহনবাগানের খুব একটা Say থাকবে না না?আজ ধরো মোহনবাগানের যে কোচ টিমটা’কে আই লিগ দিলো, তাকে অন্য দলে চলে যেতে হল কেন? আজ যদি মোহনবাগান এককভাবে থাকতো, তাহলে তো এরাই থাকতো মোহনবাগান ক্লাবে। প্লেয়ারদের লাইফটা একটু আনসার্টেন হয়ে গেল, কোন ক্লাবে খেলবে তা নিয়ে। আই লিগ খেলবে না আইএসএল খেলবে। এটা একটা সমস্যা হয়ে গেল। কিন্ত এদের কাছে আর তো কোনো উপায় নেই, যেহেতু আইএসএল’কে এখন সর্বোচ্চ লিগ করে দিয়েছে, কিছুটা নেগোসিয়েশন করলো আর কি, সেই কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার মতন। একটা ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল যাতে সারাজীবন সুখে শান্তিতে থাকতে পারে, খাওয়া দাওয়ার অভাব না হয়।

প্রশ্ন : সবশেষে একটা ছোট প্রশ্ন – ইস্টবেঙ্গলের সর্বকালের সেরা প্লেয়ার কে আপনার কাছে?

বললেন : একজন না তিনজনের নাম বলবো।মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কৃশানু দে এবং সুরজিৎ সেনগুপ্ত।

এরপরেই ব্যাডজেবের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয় তার মূল্যবান সময় আমাদের কে দেওয়ার জন্য। তিনিও সকলের সুস্থতা কামনা করেন। চিরকাল এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইস্টবেঙ্গল কে সমর্থন করার বিষয় প্রতিশ্রুতি দেন এবং তারপরেই দীর্ঘ কথোপকথনের সমাপ্তি ঘটে।


0 Comments

Leave a Reply

0 Shares
Copy link
Powered by Social Snap