“চট্টগ্রামের পরিবার, রক্তে ইস্টবেঙ্গল, যাওয়ার আগে একাডেমিটা ঠিক গড়ে দিয়ে যাবো” – একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন রঞ্জন চৌধুরী।

Published by BADGEB Admin on

Last Updated 1:35 PM 9th May 2020 .

ব্যাডজেব ডট কমের সব্যসাচী চক্রবর্তীকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন বর্তমান ইস্টবেঙ্গল ইউথ ডেভেলেন্ট প্রোগ্রামের প্রজেক্ট ডিরেক্টর এবং অনুর্ধ-১৮ ইস্টবেঙ্গল দলের কোচ রঞ্জন চৌধুরী। এবং সম্পূর্ণ কথোপকথনটি ড্রাফ্ট করলেন দেবোজ্যোতি দাসব্যবস্থাপনায় অর্ণব চৌধুরী (ব্যাডজেব)।

প্রশ্ন : স্যার আপনি এত বছর ধরে ফুটবলে সঙ্গে যুক্ত, জার্মানি থেকে টাটা ফুটবল একাডেমি হয়ে পুনে ইউড ডেভলপমেন্ট থেকে এখন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ইউথ ডেভলপমেন্ট প্রোজেক্ট ডায়রেক্টর, নিজের এই জার্নি টা নিয়ে যদি কিছু বলেন?

বললেন : (শুরুতেই কিছুটা হাসি দিয়ে বলা শুরু করলেন) টিএফএ তে আমি আসি ১৯৮৯ সালে। ওই সময় টাটা ফুটবল একাডেমি টা এতটা নলেজ বেসড্ ছিল না৷ এটা কে একটা প্রপার ফুটবল ইন্সটিটিউট বানাতেই আমাকে নিয়ে আশা, তারপর এসে একটা নলেজ বেসড্, স্টেপ বাই স্টেপ রুটিন বানালাম, চার বছরের ট্রেনিং কোর্স তৈরি বানালাম৷ ভারতের প্রায় সব ক্লাব কে ডেকে কিভাবে বেস থেকে শুরু করে প্লেসমেন্ট হবে সব বোঝালাম৷ সিস্টেমেটিক ওয়েতে চালাতে শুরু করলাম৷ ভারতের প্রথম নলেজ বেসড্ ফুটবল একাডেমি শুরু হয়েছিল টাটা ফুটবল একাডেমি থেকেই এবং সেটা সাকসেসফুল হয়েছিল৷ এরপর ২০১০-১৫ পুনেতে ছিলাম৷ ২০১৫ এর একদম শেষে ইস্টবেঙ্গলে আসি৷ এখানে ভালোই চলছে সব, আশা করছি ভালো কিছু হবে৷

প্রশ্ন : আপনি তো ইউথদের নিয়েই কাজ করেছেন, কোন সময় মনে হয়নি সিনিয়রদের নিয়ে কাজ করার কথা?

বললেন : দুবার কাজ করেছি সিনিয়র টিম নিয়ে, একবার চাম্পিয়ন হয়েছি, আর একবার রানার্স আপ। ইন্টারন্যাশনালি ইন্ডিয়ান ফুটবল অনেক পিছিয়ে। আমাদের ইন্ডিয়াতে প্রচুর ট্যালেন্ট কিন্তু সেটাতে গ্রুম করার সায়েন্টিফিক প্রসেস নেই। ফুটবলে উন্নতি করতে গেলে প্রচুর পরিমানে গ্রাসরুট লেভেলে কাজ করতে হয়, আমাদের দেশে হয়ই না।

প্রশ্ন : আমাদের দেশের অর্নুদ্ধ-১৪ কিংবা অর্নুদ্ধ-১৫ দল গুলো বাইরে গিয়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার দল গুলোকে নেক টু নেক ফাইট দিচ্ছে, কিন্তু সিনিয়র লেভেলে গিয়ে এত্তটা তফাৎ হচ্ছে কেন?

বললেন : মেইন ব্যাপার হচ্ছে গ্রুমিং, অর্নুদ্ধ-১৫ মানে তো সেটা গ্রুমিং স্টেজ। একটা ট্যালেন্টকে গ্রুম করার জন্য প্রচুর টুলস থাকে, যেমন – প্রচুর ম্যাচ, কম্পিটিশন, প্রপার ডায়েট, ফুটবলিং এডুকেশন আরোও অনেক কিছু৷ ভারতের ফুটবলের উন্নতি করতে হলে একটা প্রপার সিলেবাস দরকার যেটা প্রত্যেকটা একাডেমি ফলো করবে, এটা দেখা AIFF এর কাজ।

প্রশ্ন : আপনি ইস্টবেঙ্গলে এসেছেন ২০১৫ এর একদম শেষে, তারপর ২০১৬-১৭ তে এলিট লীগ রানার্সআপ, তারপরের বছর সেমি ফাইনাল খেলি আমরা, কিভাবে দেখছেন এটাকে?

বললেন : টোটাল ডেভেলপমেন্ট হল একটা ছেলে কোথায় স্টাট করে কোথায় ফিনিশ করছে, তার প্লেসমেন্ট কোথায় হচ্ছে। একাডেমির মেইন উদ্দেশ্য ক্যোয়ালিটি প্লেয়ার তৈরি করা, আমি নিজেই এখনও ক্যোয়ালিটি প্লেয়ার তৈরি করতে পারিনি, ট্যালেন্ট প্রচুর এসেছে। দিনে দুবার ট্রেনিং করাতে পারছি না, সেইভাবে ক্যেয়ালিটি ম্যাচ পাচ্ছি না৷ ইস্টবেঙ্গল একাডেমির জন্য আমরা সবাই মিলিত ভাবে চেষ্টা করছি, আশা করছি আগামী দু’বছরের মধ্যে বেশ কিছু বাঙালী ছেলে তুলতে পারব৷ ইস্টবেঙ্গলকে এখন ৬০% প্লেয়ার গোয়া, পাঞ্জাব থেকে আনতে হয়, সেটা কেন হবে? ৬০% প্লেয়ার একাডেমি থেকে যাবে সেই ভাবেই করতে হবে একাডেমি টাকে।

প্রশ্ন : দেখা যায় ইস্টবেঙ্গল একাডেমি থেকে প্লেয়াররা বেড়িয়ে সিনিয়র টিমে সুযোগ পায় না। কি বলবেন এটা নিয়ে?

বললেন : এখন তো সবে শুরু হল, এই বছর একাডেমির ১২টা ছেলে ইস্টবেঙ্গল রিজার্ভ দলে সুযোগ পেয়েছে৷ বিদেশে এটাই হয় একাডেমি থেকে প্লেয়ার বেড়িয়ে সেকেন্ড টিমে সুযোগ পায়৷ সেটাই এই বছর হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি ২০১৬ তে সিনিয়র টিম নিয়ে বরদলুই খেলতে গিয়েছিলেন, ওই টুর্নামেন্ট থেকে এসেই ম্যানেজমেন্ট ডংকে রিলিজ দেয়, আপনি ওই সময় ডং সম্পর্কে বলেছিলেন “Dong lacks mobility and physicality to succeed at this level” এটা নিয়ে কিছু বলবেন?

বললেন : ডং খুব ট্যালেন্টেড কিন্তু ওর প্রিপারেশন ফোকাসের অভাব ছিল৷ যদিও আমি অনেক কম দেখেছি, আরও কিছু হয়ত খেলতেই পারত। ও শুধু ম্যাচ খেলতে চাইতো কিন্তু ম্যাচের আগে মেন্টালি ও ফিজিক্যালি প্রিপারেশনের জন্য যে ফোকাস হতে হয় সেটার অভাব ছিল।

প্রশ্ন : আলেসান্দ্রো মেনেন্ডেজ গার্সিয়াকে দেখেছেন, কি বলবেন তাকে নিয়ে?

বললেন : দেখেছি বলতে, ২-৩ বার প্রাকটিসে এসেছিল, কিন্তু সেই ভাবে ইন্টারেকশান হয়নি।

প্রশ্ন : আপনি কোয়সের আগেও দেখেছেন, কোয়েস জামানা দেখলেন, কোয়েস পরবর্তী জামানাও দেখবেন। কি বলবেন? কি পরিবর্তন?

বললেন : কোন পরিবর্তন নেই। মাঠ মাঠের মত আছে, প্লেয়ার প্লেয়ারের মত আছে৷ ওই সব দেখার সময় থাকে না, অত ইন্টারেকশান করার মতও টাইম থাকে না। আমরা হচ্ছি ইস্টবেঙ্গলের লোক। পরিস্কার ভাবে বলতে গেলে আমরা চট্টগ্রামের লোক। আমরা বিদেশে-বিদেশে থেকেছি, আমার পুরো ফ্যামিলী বিদেশে থাকে আমরা হচ্ছি ফাইটার। আমার কাজ প্লেয়ার ডেভেলপ করা, বাইরের কোন কিছুই ইমপরটেন্ট নয়। প্রথমে আমার দেশ, তারপর আমার ক্লাব এখন ইস্টবেঙ্গলে আছি। এগুলোই প্রায়োরিটি। দেশের জন্য কিছুই করতে পারনি, হয়ত ৩০০টা ছেলে ইন্ডিয়া খেলেছে, কিন্তু দেশের ফুটবল ডেভেলপ করেনি। এটা আমার বিশাল বড়ো আক্ষেপ।

প্রশ্ন : অনেকে বলেছে আপনি একেবারে ফাদার ফিগার গাইড করেন, এই মূহুর্তে মেহতাব সিং, বিদ্যাসাগর সিনিয়র টিমে খেলছে, এই সাফল্যটাকে কিভাবে দেখবেন?

বললেন : দেখো সাফল্য কি জিনিস আমি জানি না, আমার হাত ধরে ৩০০টা ছেলে ন্যাশনাল টিমে খেলেছে, ১০ বছর আগে আমি গিনিস বুক অফ ওয়াল্ড রেকর্ড ভেঙে দিয়েছি, এর আগে কোন কোচের হাত ধরে এত প্লেয়ার তাদের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্ট করেনি। মেইন কথা হচ্ছে আমার যে ধরনের প্লেয়ার প্রডিউজ করার কথা সেটা এখনও পারিনি।

প্রশ্ন : আপনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সাথে যুক্ত আছেন অনেক দিন, আপনি দেখছেন ১৭ বছর ধরে ক্লাবে আই-লিগ নেই। কোচ চেঞ্জ, প্লেয়ার চেঞ্জ তবুও কিছু হচ্ছে না। সমর্থকরা আক্ষেপ করছে, কি বলবেন?

বললেন : দেখো এই ব্যাপারে তো আমি বেশি কিছু বলতে পারব না, সবাই মিলে চেষ্টা করছে তবুও আসছে না, সমর্থকদের ক্ষোভটা স্বাভাবিক। এই বছরও খুব ভালোই দল হচ্ছে আশা করছি ভালো কিছু হবে। তবে দেখে কোচের ভূমিকা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, তার রোল, তার ফিলোজফি ভীষন রকম প্রভাব ফেলে৷

প্রশ্ন : তাহলে কি এবার থেকে সিনিয়র টিম আর রিজার্ভ টিমের মধ্যে একটা চেইন তৈরি হল?

বললেন : সেটা ম্যানেজমেন্ট ঠিক করবে, ওরা বলতে পারবে।

প্রশ্ন : স্যার আপনার হাতে তৈরি ইস্টবেঙ্গলের অর্নুদ্ধ-১৮ দলের সেরা ৩ জনের নাম বলতে বললে, আপনি কাদের নাম নেবেন?

বললেন : সেই ভাবো এখনও প্রটেনশিয়াল ডেভেলপ করতে পারিনি, দু-বেলা ট্রেনিং এর দরকার সেটা হয় না৷ হিসেব মতো ২ বছরে ৪০০০ ঘন্টার ট্রেনিং কমপ্লিট করতে হয় একটা প্রপার শিডিউল মেনে কিন্তু এখানে ২ বছরে ৫৫০-৬০০ ঘন্টা ট্রেনিং করিয়ে প্রপার কোয়ালিটি প্লেয়ার তৈরি করা মুশকিল।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল ক্লাব একটা ১০০ বছরের ক্লাব শুধু ইস্টবেঙ্গল নয় আরো অনেকে ইউথ ডেভলপমেন্ট অনেক দেরিতে শুরু করেছে, যেটা অনেক আগে হওয়া উচিত ছিল, কি বলবেন?

বললেন : দেখো আমি আসার পর অনেক কিছু পেয়েছি, ভারতবর্ষে আমি একমাত্র যে বিদেশ থেকে স্পোর্টস নিয়ে ৫ বছর ডিপ্লোমা করেছি। ম্যানেজমেন্ট আমার সাথে অনেক আলেচনা করে, একাডেমি সবে শুরু হল যেটা আগে ছিল না। আমি যখন এসেছি, আমার ওপর যখন ভরসা আছে নিশ্চই ভালে কিছু করে যাব। একটা ভালে এস্টাবলিস্ট একাডেমি করেই যাব৷ আমি হয়ত আর ম্যাক্সিমাম ৪-৫ বছর কাজ করতে পারব। চট্টগ্রামের পরিবার, রক্তে ইস্টবেঙ্গল, যাওয়ার আগে একাডেমিটা ঠিক গড়ে দিয়ে যাবো। দরকার পড়লে নিজের থেকে একটা জায়গা নিয়ে যাওয়ার আগে যাতে একটা প্রপার স্পোর্টস স্কুল একটা একাডেমি করে যেতে পারি।

(তারপরে আরো কিছু গল্প, নানান কথোপকথন)

সব্যসাচী : পুরো ইস্টবেঙ্গল ফ্যান বেসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আরো এগিয়ে যান, আমরা সকলে আছি আপনার সাথে।

রঞ্জন স্যার বললেন : তোমরাও খুব ভালে থেকো, আমি আপ্রান চেষ্টা করে যাবো ইস্টবেঙ্গলের জন্য, রক্ত তো ইস্টবেঙ্গলের রক্ত।


0 Comments

Leave a Reply

0 Shares
Copy link
Powered by Social Snap