“খেলোয়াড় জীবনে অনেক আক্ষেপ থাকলেও সমর্থকরা আমার কাছে অক্সিজেন, বেঁচে থাকার রসদ” – একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন অনিত ঘোষ।

Published by BADGEB Admin on

Last Updated 8:19 PM 29th May 2020 .

ব্যাডজেব ডট কমের অরিত্র দাসকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন প্রাক্তন ফুটবলার এবং ইস্টবেঙ্গলের পঞ্চমুকুট জয়ী অধিনায়ক অনিত ঘোষ। প্রশ্ন চয়নে সাহায্য করেছেন সুমন্ত সেনগুপ্ত, হিন্দোল পালিত, হীরক ঘোষ। এবং সম্পূর্ণ কথোপকথনটি ড্রাফ্ট করলেন অরিত্র দাস।

ফোন ধরেই কিছু কথোপকথন তারপরেই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের নানান উদ্যোগকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন। আক্ষেপ করলেন যে এখনকার ফ্যান্সদের যা এক্টিভিটি সেটা তাদের সময় ছিলোনা, থাকলে তারা উপভোগ করতেন। যদিও তিনি যে বরাবরই প্রচার থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন সেটা জানাতে ভুললেন না আমাদের। আমাদের ওয়েবসাইটের নানান নিউস পড়েন বলেও জানালেন এবং আমাদের ওয়েব পোর্টালের আইডিয়াটার প্রশংসা করেন। ব্যাডজেবের পক্ষ থেকেও তাকে ধন্যবাদ জানানো হয় তার মূল্যবান সময় আমাদের কে দেওয়ার জন্য। তারপরে শুরু হয় মূল আলোচনা।

প্রশ্ন : প্রথমেই নিজের ফুটবল জীবনের শুরুর দিনগুলো এবং কলকাতা ময়দানে নিজের আত্মপ্রকাশ নিয়ে যদি কিছু বলো। কেমন ছিল সেই দিনগুলো?

বললেন : তুমি হয়তো জানো আমরা টিএফএর দ্বিতীয় ব্যাচ। আমাদের ব্যাচটা ছিল শঙ্কর লাল চক্রবর্তী, দিব্যেন্দু বিশ্বাস, রেনেডি সিং, কল্যাণ চৌবে, অভয় কুমার, সুশান্ত মজুমদার, আমরা সব একসাথে আসি। মোহনবাগানে সই করি। এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়াও নানান ক্লাব থেকে বড় প্রস্তাব আসে কিন্তু আমরা রিফিউস করি কারণ আমরা নিজেদের প্রফেশনাল ফুটবলার হিসাবে তৈরি করতে চেয়েছিলাম, সো আমরা চাকরি নেবনা ঠিক করেছিলাম। তোমরা জানো আমার কাছে ইস্টবেঙ্গলের বড় অফার ছিল, তাও যখন আমরা মোহনবাগানে সই করি তখন ইস্টবেঙ্গল আমার বিরুদ্ধে ডাইরি করে দিয়েছিল থানায় (কিছুক্ষন হাসি) এবং অনেক চাপ দিয়েছিল যাতে আমি সই করি। কি করবো বুঝতে না পেরে অঞ্জন মিত্রে পরামর্শে আমিও পাল্টা ডাইরি করি ময়দান থানায়। একাডেমিতে থাকাকালীন পিকে স্যারের অনেক ক্লোস ছিলাম আমরা কয়েকজন। অনেক কিছু শিখেছিলাম স্যারের থেকে। নিজের জীবনের নানান গল্প বলে আমাদের উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি। আসতে আসতে ১৯৯৬ সালে জুনিয়র ইন্ডিয়া থেকে সিনিয়র ইন্ডিয়া টিমে ঢুকি, মোহনবাগানে সই করার আগে। মোহনবাগানে সই করেছিলাম হাবিব স্যার এসেছিলেন সেই কারণেই আসলে, কারণ এখনো আমাদের কয়েকজনের কাছে উনি নেক্সট টু গড। আমরা টিএফএর সেই ব্যাচটা খুব লাকি যে আমরা টোটাল তিনজন কোচের আন্ডারে খেলেছিলাম (পিকে স্যার, হাবিব স্যার, রঞ্জন স্যার) যারা নিজেরা এক একটা ইনস্টিটিউশন ছিলেন। মোহনবাগানে সই করলাম, সত্যজিৎ দা ছিলেন সেই সময়, প্রচন্ড ভালো গাইডেন্স পেয়েছিলাম আমরা, তবে মরশুমে শেষে কিছু গন্ডগোল হয় এবং আমি তারপরে ক্লাব ছেড়ে দি। সেই সময় আমি আরবিআই, সিইএসসির অফার পাই কিন্তু ঢুকিনি সেই একই কারণে, আমি আর আমার দাদা চেয়েছিলাম প্রফেশনাল ফুটবলার থাকতে, খেলার সাথে চাকরি করার কোনো ইচ্ছা ছিলোনা আমার। সব মিলিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন : টিএফএ থেকে ৯৬ এ মোহনবাগান, তারপর ৯৭ তে চার্চিল হয়ে ৯৮ সাল থেকে ইস্টবেঙ্গল এবং সেখানে মোটামুটি ঘরের ছেলে হয়ে ওঠা। সেই সময় একজন বাঙালি হয়ে বাইরের রাজ্যে গিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন?

বললেন : হ্যাঁ, আমি চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে চার্চিলে চলে যাই পরের মরশুমে মোহনবাগান থেকে। আমিই কিন্তু প্রথম বাঙালি ফুটবলার যে প্রফেশনাল ফুটবল খেলার জন্য অন্য রাজ্যে চলে যায়। সেই বছরটা আই স্টার্টেড সো ওয়েল, আমি হায়েস্ট পেইড প্লেয়ার ছিলাম চার্চিলে। কিন্তু আই লিগে আমার লাইফে একটা খুব খারাপ দিন আসে, এফসি কোচি ভার্সেস চার্চিল ব্রাদার্স ম্যাচে, আমরা তিন-দুই গোলে হেরে যাই আর ওই তিনটে গোলের মধ্যে দুটো আমার পা থেকে সেম সাইড হয়। আমাদের টিমের কোচ ছিলেন আর্মান্দো কোলাসো, ওই ম্যাচের পরে আমি খুব ভেঙে পরি, কারণ আমি তখন ইন্ডিয়ার এক নম্বর ডিফেন্ডার ছিলাম, এরকম ভাবে পরাস্ত হয়েছিলাম যে মেনে নিতে পারিনি। সেই সময় আর্মান্দো স্যার প্রচন্ডভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

প্রশ্ন : খেলোয়াড় জীবনে সব থেকে বেশি সমর্থন এবং সহযোগিতা কার থেকে পেয়েছেন?

বললেন : আমার খেলাধূলায় সাফল্যের পিছনে সব থেকে বড় অবদান ছিল আমার দাদা এবং মায়ের। আমার ফ্যামিলি ব্যাক গ্রাউন্ড বললে বুঝবে আমাদের বাড়ির সবাই গানের সাথে যুক্ত ছিল, আমিও ছোটবেলায় তবলা বাজাতাম। আমার দাদা অন্যদিকে স্বপ্ন দেখতেন বড় প্লেয়ার হবেন, কিন্তু হতে পারেননি কারণ আমার বাবার স্বপ্ন ছিল দুই ছেলে, একজন ডাক্তার হবে একজন উকিল হবে, যেমনটা হয় আরকি প্রত্যেক পরিবারে। আর আমার দাদা ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল, তাই বাবা চাইতো ও পড়াশুনা নিয়েই থাকুক। একদিন সকালে বাবা, আমার দাদা সমস্ত ফুটবল কিট ধরে জ্বালিয়ে দেয়। তারপর থেকেই বাবা দাদার সম্পর্ক ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মতো হয়ে যায়। তারপরেই দাদা যখন দেখলো যে সে হতে পারলো না, তখন আমাকে ফুটবলার বানানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। আমি অনেক খেলাই ভালো খেলতাম কিন্তু দাদা আমাকে একটা নির্দিষ্ট খেলায় ফোকাস করতে বলেছিল। তারপরেই ফুটবলকে ঘিরে স্বপ্ন দেখা শুরু, সাথে দাদার বিশাল সাপোর্ট। মানে এরকমও হয়েছে ৯৬ সালে ম্যাচ খেলে ফিরছি বাড়ি, দাদা আমাকে বোঝাতে বোঝাতে আমার ভুলগুলো আমাকে ট্রেনের মধ্যেই মারতে শুরু করে, বাকি প্যাসেঞ্জাররা ঘাবড়ে যায়, ভাবে বাচ্চা ছেলেটাকে মারছে কেন এইভাবে। এরকমই নানান গল্প আছে, ও কিভাবে আমাকে আগলে রেখে আমাকে এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছিল এই নিয়ে। আমার মাও আমাকে রোজ কলকাতায় প্র্যাক্টিসে নিয়ে আসতেন তারপরে নিজের গানের ক্লাস শেষ করে আমাকে নিয়ে ফিরে যেতেন বাড়ি ফিরতে ফিরতে রোজ রাত হয়ে যেত।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গলের প্রতি ডেডিকেশনটা ঠিক কেমন ছিল ফুটবল জীবনে?

বললেন : আরে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবেই আমি সারাদিন পরে থাকতাম, মানে সকালে ঢুকতাম বিকেলে বেড়াতাম। অনেকটা অফিসের মতো ৮-১০ ঘন্টা ডিউটির মতো, মানে মাঠ আর খেলা ছাড়া আমি কিছুই জানতাম না। পল্টু দা বলতেন যে তোরা কি করছিস এখনো ক্লাবে? নিতু দা আমার বাড়ির লোক কে বলতেন, ওকে একটু সিনেমা দেখতে যেতে বলুন মাঝে মাঝে। ১৯৯৮ সালে আমরা মোট ৮ জন সই করেছিলাম টিএফএর, তো আমরা সারাদিনই সবাই মিলে ক্লাবে কাটাতাম। শীতকালে লনে তেল মেখে সব বসে থাকতাম সারাদিন। এখন ক্যাফেটেরিয়া, জিম, কত কিছু। আমরা কিছুই পাইনি সেই সময়, না পেয়েছি কোনো সরঞ্জাম না কিছু কিন্তু তাও, যা আনন্দ করেছিলাম আমরা সবাই মিলে এই ক্লাবে তা কল্পনার বাইরে, যেটুকু পেয়েছি মনে হতো স্বর্গ পেয়েছি। ৯৮ এ পিকে স্যার ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, মোহনবাগানের অফার থাকলেও আমার ইস্টবেঙ্গলে আসার পিছনে কারণ ছিলো পল্টু দা, মনীশ ব্যানার্জি এন্ড পিকে স্যার। নিতু দাও কারণ ছিল, কারণ ৯৬ সাল থেকে নিতু দা আমাকে টার্গেট করে রেখেছিল, তখন হয়তো আমি আসিনি ইস্টবেঙ্গলে কিন্তু উনি আমার উপরে নজর রেখেছিলেন।

প্রশ্ন : পাঁচে পাঁচ মানে ২০০২ মরশুমে তুমি অধিনায়ক। হঠাৎই মরশুমের শেষ দিকে চোট পেয়ে দল থেকে ছিটকে যান। পরেরবার আশিয়ান জয়ী দলে চোট থাকার জন্য জায়গা হয়নি। অথচ সুস্থ থাকলে সেই দলের অটোমেটিক চয়েস হতে তুমি। কোথাও কি আক্ষেপ হয় এ জন্য ?

বললেন : একদম একদম। শুধু তাই নয় অরিত্র, আমার সাথে ক্লাবের সম্পর্কও খারাপ হয়ে যায় জানো। আমি হয়তো সেই সময় অনেক কিছুই ফেস করেছিলাম যেগুলো কখনো আশা করিনি।

প্রশ্ন : আরো একটু সহমর্মিতা কি আশা করেছিলে ক্লাবের থেকে সেই সময়? আরো একটু সাপোর্ট পেলে কি ঘুরে দাঁড়ানো যেত আবার বলে তোমার মনে হয়?

বললেন : একদমই তাই। এই প্রয়োজনীয় সাপোর্টটা পাইনি আর তারপরেই আমার জীবনে স্ট্রাগেল শুরু হয় এবং আবার শুরু থেকে সব শুরু করতে হয়। এই কারণেই আমার কেরিয়ার হয়তো আরো দীর্ঘায়িত হয়নি, চেষ্টা করিনি তা না কিন্তু মনটা ভেঙে গেছিলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখতাম হটাৎ পাশে আমার ক্লাব, সমর্থক, অফিসিয়াল কেউ নেই, তখন রীতিমতো মানসিক সমস্যায় ভুগতাম। আমার তারপরে বিয়ে হয়, আমি খুব লাকি যে শকুন্তলার (অনিত ঘোষের স্ত্রী) মতো একজন কে পাশে পেয়েছিলাম সেই কঠিন সময়, আমাকে সব রকমের সাপোর্টও দিত, আমাকে কত কিছু বোঝাতে মন শক্ত করার জন্য। একের পর এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি পেয়ে এসেছি সেই সময় ফুটবলের সাথে যুক্ত থাকা মানুষগুলোর থেকে সেই সময়। শুধু কিন্তু আমি না, এরকম প্রচুর প্লেয়ারের সাথে হয়েছে, একবার চোট পেয়ে গেলে তোমাকে আর কেউ চেনেনা, যেমন দীপক মন্ডলও কিন্তু পায়নি ক্লাব থেকে সাপোর্ট। আজ প্রবীর দাস কে সাপোর্টটা পেলো এটিকে থেকে আমরা কোথায় পেয়েছি সেই সব? কিন্তু এই ক্লাবই কিন্তু আমাদের জীবন ছিল, আমি দীপক আমরা অনেক বড় ক্লাবের অফার নিনি শুধু ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্য, কারণ টিএফএ তে আমরা নিজের দলকে ভালোবাসার এই শিক্ষাটাই পেয়েছি। এরকম অনেক আক্ষেপ আছে গো, কিন্তু এখন আর এইসব নিয়ে ভাবিনা জানো, কারণ কি পাইনি সারাক্ষন ভাবলে আসতে আসতে জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা চলে যায়।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল দল থেকে বাদ পরার পরের কামব্যাক স্টোরি টা ঠিক কেমন তোমার?

বললেন : আমার প্রচুর কামব্যাক আছে জীবনে। মানে ধরো ২০০৩ ইস্টবেঙ্গল দল যখন যাচ্ছে আসিয়ান কাপ খেলতে, তখন আমার সাথে ক্লাবের মন কষাকষি অনেকটাই বেড়ে গেছে। পরবর্তীকালের আমি নানান অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হই, অন্য ক্লাবে গিয়েও হই। এক কথায় বলতে জীবনটা খুব কঠিন হয়ে গেছিল সে সময়। এইসব থেকে অনেক কিছুই শিখেছি, আমি বলবো ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান-মহামেডান সব এক টাকার কয়েনের এপিঠ আর ওপিঠ। আমি সোজা কথা বরাবর সোজাভাবে বলি তাই ময়দানের সব থেকে বিতর্কিত চরিত্র আমি। রঞ্জিত বাজাজ যেমন খুব বিতর্কিত চরিত্র, সেও আমার খুব ভালো বন্ধু, ও সত্যিটা এমনভাবে বলে যে অনেকেই সেটা নিতে পারেনা। আমি প্রকাশ্যে আর বেশি কিছু বলবোনা, অনেক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে আমি সেই সময়, কলকাতা ময়দানটাকে খুব কাছ থেকে চিনে নিয়েছি। সেই সময় ইস্টবেঙ্গল কোচ সুভাষ দার থেকেও সাপোর্ট পাইনি, সাপোর্ট পাইনি কোনো মিডিয়ার থেকে। তবে বলতে দ্বিধা নেই বাংলা তথা ভারতীয় ফুটবলের নবজাগরণ এনেছিল সুভাষ ভৌমিক। নিজের দায়িত্বে ক্লাব কর্তাদের রাজি করিয়ে, আসিয়ান টিমটার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বিদেশি ট্রেনার, ডায়েট। আমার দুর্ভাগ্য বলতে পারো যে এরকম একজন মানুষের হাত আমার কাধে ছিলোনা আমার দুরসমায় উল্টে মিডিয়া আমাকে নিয়ে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা খবর করেছে এক সময় কোন স্বার্থে তা আমি জানিনা। মহামেডান ২০০৮ এ খেলার খেলার সময় আমি ৮ ম্যাচ খেলি যার মধ্যে দুটোতে ম্যান অফ দা ম্যাচ হই। ওই মরসুমেই এক ম্যাচে আমি দারুন সাফল্য পাই তারপরেই শান্তি দা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছু কথা বলেন, আমাকে বাহবা জানান, বলে তুমি আবার নিজেকে প্রমান করলে অনিত, আমি সে কথা শুনে মাঠের মধ্যেই কেঁদে ফেলি।

প্রশ্ন : বর্তমানে ক্লাবের অনেক অনুষ্ঠানেই তো তোমাকে দেখা যায় আবার। এখন সবার সাথে আশা করি সব সমস্যা মিটে গেছে?

বললেন : আমি যেতাম না গো। আমি তেমন যেতাম না, এক বছর হলো আবার যাওয়া শুরু করেছি। এই শতবর্ষের উৎসবের সময় থেকে আবার নানান অনুষ্ঠানে যাচ্ছি, ডাকলে যুক্ত হওয়া চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল অধিনায়ক হিসেবে যে পঞ্চমুকুট জয়ের কৃতিত্ব, সেটা নিয়ে ঠিক কতটা গর্বিত তুমি? এটা কি জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত?

বললেন : একদম একদম, আমি তো বলছি আমার কেরিয়ারের বেশিরভাগ সময়টা আমি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে কাটিয়েছি। আমি নিজে বাঙাল। তুমি যদি আমাকে প্রশ্ন করো যে ড্রেসিংরুম থেকে ক্লাব পরিবেশ, ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান কাকে এগিয়ে রাখবে? আমি বলবো অবশ্যই ইস্টবেঙ্গলকে। মানে যতদিন আমি সুস্থ ছিলাম, চোটমুক্ত হয়ে সেরা ফর্মে ছিলাম তখন আমার প্রচুর সম্মান এবং গুরুত্ব ছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে। ক্লাব থেকে আমি কিছু নিতে আসেনি আমি দিতে এসেছিলাম, এখনো দেওয়ার জন্যই আছি। ক্লাব যদি আমাকে ডাকে এখনো কোনো কাজে যাতে ক্লাবের ভালো হবে, আমি নিশ্চই যাবো, করবো। আমরা টিএফএ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছি যে ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে। ভবিষ্যতে ইস্টবেঙ্গল ক্লাব আমাকে কোচ হলো, এডমিনিষ্ট্রেটর বলো যেভাবেই পেতে চাক আমি সবসময় ক্লাবের সাথে আছি, ক্লাবের ডাকে রাজি হয়ে যাবো।

প্রশ্ন : একটু মজার প্রশ্নে যাই, অনিত ঘোষ কে কিন্তু শুধু খেলোয়াড় হিসেবে চেনেনা কলকাতা ময়দান। অনিত ঘোষকে বাংলার ফুটবলে প্রথম স্টাইল আইকন বলা হয়। এই বিষয়টা কতটা উপভোগ করো তুমি?

বললেন : আসলে কি বলতো বাবু, আমি আমার পুরো কেরিয়ারে জানতাম না স্টাইল কি, বা আমাকে সত্যিই স্টাইল আইকন বলা হয় কিনা সেটা, মানে আমি কোনোদিন এইভাবে ভাবিনি। যেটুকু স্টাইল ছিল সেটা হয়তো টিএফএতে থাকাকালীন হাবিব দার কথাতেই শেখা, তিনি সবসময় বলতেন ‘আচ্ছা সোচো, আচ্ছা খেলো, আচ্ছা খাও, আচ্ছা পেহেনো’, এটা বেসিক ছিল আমাদের এডুকেশনের। নঈম দা টিএফএ কে বলতেন পিঅফএ, মানে ‘পাকা ফুটবল একাডেমি’, উনি আমাদের উপরে রেগে বলতেন এইসব কারণ আমরা দামি বুট পড়তাম, দামি পোশাক পড়তাম, আর সেই সময় ইস্টবেঙ্গলের বাকি প্লেয়াররা খুব সিম্পেল টাইপের ছিল। তুষার রক্ষিতদের মতো মানুষদের থেকে যে কত কিছু শেখার ছিল, ধারণা করতে পারবেনা, কিন্তু তুমি তাকে দেখলে বুঝতেই পারবেনা যে সে এত বড় প্লেয়ার, এতটাই সিম্পল ছিল সেই মানুষটা। মাথায় চুপচুপে করে নারকোল তেল মাখতো তুষার দা জানিস, সে পুরো তেল চুয়ে চুয়ে পড়তো। অনেক কষ্টে জিন্স পড়ানো হয়েছিল তুষার দা কে, কিন্তু এমনভাবে পরে এসেছিল সে আমাদের কি হাসি সবার। তো এরকমই মানুষদের ভিড়ে আমরা কয়েকজন একটু ভালো কিছু করলেই চোখে পড়ে যেতাম সবার। আমি খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরে প্রথম একদিন অনিলাভর স্ত্রী শর্মিষ্ঠার থেকে জানতে পারলাম যে আমাকে নাকি প্রথম স্টাইল আইকোন মানা হতো, তারপরে সে কি হাসাহাসি।

প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ কোনো বার্তা?

বললেন : ইয়েস, যখন আমাকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয় বা শুনি তখন ভালো তো লাগে ঠিকই কিন্তু সাথে সাথে এটাও মাথায় রাখি যে মানুষের ভালোবাসা, সমর্থকদের ভালোবাসা যেন কোনোভাবে না কমে যায়, এমন কিছু করবো না যাতে সমর্থকরা আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কারণ আমি সবসময় মনে করি ভাই, তোমাদের থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা বলে বোঝানো মতো না, তোমরা আমার কাছে লাইফে অক্সিজেনের মতো। ক্লাব থেকে হয়তো যতটা প্রত্যাশা ছিল আমি পাইনি কিন্তু আমি আমার সাপোর্টারদের থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি এটা অনেক জন্ম ভালো কাজের ফল মনে হয়।

এরপরেই ব্যাডজেবের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয় তার মূল্যবান সময় আমাদের কে দেওয়ার জন্য। তিনিও জানান যে তিনি সম্মানিত ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের এই ভালোবাসায়। এরপরেই উভয়পক্ষের সম্প্রীতি বিনিময়ের মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনার সমাপ্তি ঘটে।

0 Shares
Copy link
Powered by Social Snap