“গ্যালারীতে জ্বলল মশাল, কাজ করতে শুরু করছে আলেজান্দ্রো ম্যাজিক” – লিখছেন অর্পণ গুপ্ত

Published by Aritra Das on

গোলের পরে কোলাডোর উচ্ছাস

স্প্যানিশ ফুটবলের নির্যাস নিয়ে পেপ গুয়ার্দিওলা যখন প্রথমবার বার্সেলোনা থেকে বায়ার্ণ মিউনিখ গেলেন তখন বলা হয়েছিল জার্মান ফুটবলে ওই তিকিতাকা পাসিং এর জায়গা নেই৷ ফুটবল অনেক বেশি ডাইরেক্ট। পেপ নিজেকে ভাঙেন নি, নিজের ফুটবল দর্শনে অটল থেকে পাসিং ফুটবলের আদলে বসিয়েছেন জার্মান গতি। বায়ার্ণ মিউনিখ থেকে ম্যাঞ্চেস্টার সিটিতে এসে ভেঙে দিয়েছেন বহুবছরের গেঁথে যাওয়া ব্রিটিশ ফুটবলের মিথ। স্প্যানিশ টাচ কিংবা শর্টপাসের ফুটবলের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ থাকা প্রিমিয়ারলীগকে একা হাতে প্রায় বানিয়ে ফেলেছেন সিটি প্রিমিয়ার লীগ। এখানেই আরও স্পষ্ট হয়েছে ফুটবলবিজ্ঞান- তোমার দর্শণ ই শেষ কথা- খেলোয়াড় থেকে সাপোর্টিং স্টাফ অলংকরণ মাত্র।
রিয়ালমাদ্রিদ যুব একাডেমির দায়িত্বে থাকা আলেজান্দ্রো মেনেন্দেস গার্সিয়া যখন ভারতে পা রাখেন তখন থেকেই প্রশ্নটা ঘুরছিল বাংলা ফুটবলের আনাচে-কানাচে থাকা প্রতিটি মানুষের মাথায়। কেন ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাব থেকে স্পেনের জাতীয় দলে লোপাটোগির সাথে কাজ করার অফার থাকা স্বত্ত্বেও ভারতের মতো ফিফা র‍্যাঙ্কিং-এর ১০০ এর ও বাইরে থাকা দেশের ক্লাবে কোচিং করাতে এলেন তিনি? এর উত্তর হয়ত সেই ফুটবল দর্শন যা নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে তাড়া করে বেরিয়েছে আলেহান্দ্রোকে।
কলকাতালীগ আর ডুরান্ড কাপে নিজের দলের রিজার্ভবেঞ্চকে তৈরী করার মঞ্চ হিসাবেই বরাবর দেখবেন তিনি মরশুম শুরুর আগে এমনটাই জানিয়েছিলেন আলেহান্দ্রো৷ কলকাতা ময়দানে বড়ক্লাবের চাপের ভারেও কিন্তু নিজের মত থেকে এতটুকু সরেন নি এই স্প্যানিশ। মরশুমে এখনো অবধি ৮ টি ম্যাচ খেলল ইস্টবেঙ্গল৷ ডুরান্ডকাপে সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে না হারলে হয়ত মরশুমের প্রথম ট্রফিও এসে যেত শতবর্ষের বছরে লালহলুদ তাঁবুতে, কিন্তু তা নিয়ে আক্ষেপ নেই আলেহান্দ্রোর। তাঁর পাখির চোখ আইলিগ৷ ইতিমধ্যেই নিজের দলের সব পজিশনের জন্যেই রিজার্ভ বেঞ্চ তৈরী করে নিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি দলের খেলার মূল কাঠামোকে প্রতি ম্যাচেই আরও মজবুত করছেন কোচ।
বি এস এস ম্যাচের কাদামাঠে যে খেলাটা চেষ্টা করেও ১০০% সফল হওয়া যাচ্ছিল না এরিয়ান্স ম্যাচের শুরু থেকেই সেই খেলাটা খেলতে শুরু করলেন কোলাডো-ডিকা-সামাদ-কাশিমরা। বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছিলেন ডিকা কাশিম আর কোলাডোর ত্রিভুজ, ডানদিক দিয়ে সামাদ আলি মল্লিক এই মরশুমে যে দলের অন্যতম সম্পদ হতে চলেছেন তা বুঝিয়ে দিলেন প্রতিটা মুহুর্তেই। প্রথমার্ধের শেষের দিকে সামাদের দুরন্ত গ্রাউন্ডার ক্রসে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন বিদ্যাসাগর। এর কয়েকমিনিট পরেই ব্রেন্ডনের সাথে ওয়াল খেলে বাঁ পায়ে এরিয়ান্সের জাল কাঁপিয়ে দেন ইস্টবেঙ্গলের বহুযুদ্ধের নায়ক ডিকা।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন খেলার রাশ আরও নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ইস্টবেঙ্গল। এসময়ে এরিয়ান্স গোলকিপার পাহাড় হয়ে না দাঁড়ালে গোলের ব্যবধান আরও বেশি হতেই পারত। এসময়েই প্রতিদিনের মতোই ফের ঝলসে উঠলেন কোলাডো, দুই ডিফেন্ডারের মাঝখান থেকে থ্রু বল ধরে আগুয়ান গোলকিপারের পাশ দিয়ে বাঁ পায়ের ক্লিনিকাল শটে গোল করে যান স্প্যানিশ তরুণ। এরপর রোনাল্ডো অলিভিয়েরাকে নামান আলেজান্দ্রো। গোয়ানিজ স্ট্রাইকারের ছটফটানিতে আবারও নড়ল এরিয়ান্সের রক্ষণ,এই সুযোগেই নিজের দ্বিতীয় ও দলের তৃতীয় গোল করে গেলেন কোলাডো। দ্বিতীয়ার্ধে বিদ্যাসাগর সিং কয়েকটি সহজসুযোগ যদি আর একটু বুদ্ধি করে শট নিতেন তাহলে ফলাফল বাড়তেই পারত।সারাম্যাচে অনবদ্য খেললেন ইস্টবেঙ্গলের স্টপার মার্তি ক্রেসপি। জর্জ ম্যাচে সমর্থকদের মন না জিতলেও যত সময় যাচ্ছে তত যেন নিজেকে মেলে দিচ্ছেন এই স্প্যানিশ, শুধু ডিফেন্স থেকে বল ওড়ানো নয় বরং মাঝমাঠে দুরন্ত ডিস্ট্রিবিউশনেও নজর কাড়ছেন মার্তি।
এদিকে ম্যাচের ষাট মিনিটের পর আলেজান্দ্রো নামান আম্বেকর ও কমলপ্রীতিকে। এ সময়ে মাঠে ৪ জন সাইডব্যাক হয়ে যেতে চমকে যান অনেক দর্শক। কিন্তু এই ঘটনা নতুন নয়, ২০১৩ কনফেড কাপে ইতালী কোচ এন্টোনিও কন্তে এই টেকনিক ব্যবহার করেছিলেন, দুই সাইডব্যাক যখন ওভারল্যাপে যায় তখন নীচে কভার করে বাকি দুজন। এই টেকনিকে উইংপ্লের সর্বোচ্চ পরীক্ষা হয়ে যায়।
আলেজান্দ্রোর বিজয়রথ হয়ত লম্বা মরশুমে সবসময় একই গতিতে দৌড়োবে না, লম্বা মরশুমের নিয়মে কিংবা বাংলা ময়দানের চোরাবালিতে আটকাবে ইস্টবেঙ্গল কিন্তু আলেহান্দ্রোর ফুটবল দর্শনে একে একে উঠে আসছে বিদ্যা-মনোজ-সামাদ-পিন্টু-শুভনীলের মতো তরুণ প্রতিভারা, লম্বা রেসের আইলিগে এই শক্তিশালী রিজার্ভবেঞ্চ কিন্তু এগিয়ে দেবে ইস্টবেঙ্গলকে, প্রতিম্যাচে প্লেয়ার রোটেট করে আলেজান্দ্রো যেমন ক্লান্ত হতে দিচ্ছেন না কোনো খেলোয়াড়কে তেমনি নিজের তূণীতে থাকা প্রতিটি অস্ত্রে শান দিয়ে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত৷ পরের ম্যাচই কলকাতা ফুটবলের মহারণ। আলেজান্দ্রো এখনো এই মহাযুদ্ধে অপরাজিত। তিনি জানেন এই ম্যাচ একটা মোমেন্টাম সেট করে দেবে, তাই হয়ত নিজের দলের মোক্ষম অস্ত্র মার্কোসকে এই ম্যাচে আড়ালেই রাখলেন কোচ।

রবিবারের মহারণের আগে কিছুটা মনোবল বেড়ে রইল লালহলুদ শিবিরে,মাঠ ছাড়ার আগে আলেহান্দ্রোর মুখে চওড়া হাসি,তিনি জানেন তাঁর স্ট্র‍্যাটেজি কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে, মাঠে দর্শকদের রঙিন রংমশালের মতোই আকাশে আরও উজ্জ্বল হচ্ছে লালহলুদ রংদুটো,নিজের ফুটবলজ্ঞানের ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখেই ইস্টবেঙ্গলের অধরামাধুরী ছুঁতে পারেন কিনা স্প্যানিশ যাদুকর এখন সেটাই দেখার…

0 0

1 Comment

Debargha Chatterjee · 29th August 2019 at 8:01 AM

দারুন লেখা, বিশ্লেষণবেশ ভালো

Leave a Reply

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: